বাংলার কথা সাহিত্য 04 ------শ্রীকৃষ্ণকীর্তন----

 শ্রীকৃষ্ণকীর্তন  বৈষ্ণব কাব্য। রচয়িতা  বড়ু চন্ডীদাস। রচনাকাল সঠিকভাবে নির্ণীত না হলেও প্রাকচৈতন্য যুগের (খ্রিস্টীয় ১৪শ শতক) মনে করা হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদের পরেই শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের স্থান।

বাংলার কথা সাহিত্য

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান নিদর্শন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।।

১৯০৯ সাল। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাকিল্য গ্রামের এক বাড়ির গোয়াল ঘর থেকে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ আবিষ্কার করেন ধুলোমাখা একটি পু্ঁথি। তখনো হয়তো তিনি জানতেন না বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য নিদর্শন তিনি আবিষ্কার করেছেন।পুথিটির প্রথম এবং শেষের দিকের কিছু পাতা পাওয়া যায়নি বলে এর নামধাম, কবির পরিচয়, রচনাকাল ইত্যাদি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।এছাড়া পুঁথির মাঝের কিছু পৃষ্ঠাও পাওয়া যায় নি।রীতি অনুযায়ী পুঁথির প্রথম দিকে দেবতার প্রশংসা, কবির পরিচয় ও গ্রন্থনাম উল্লিখিত হয় এবং শেষের দিকের কিছু পাতায় রচনাকাল ও লিপিকাল লিখি থাকে।এখানে প্রথম ও শেষাংশ খন্ডিত থাকায় কবির আত্মপরিচয় ও রচনাকালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়।১৯১৬ সালে তারই সম্পাদনায় গ্রন্থটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়।এরপরই পন্ডিতমহলে তা ব্যাপক সাড়া জাগায়।

বৈষ্ণব মতবাদে গৃহীত রাধাকৃষ্ণের রুপকের বাইরে এ কাব্যের পরিচয়।বৈষ্ণব সাধনা ও ঐতিহ্যের বিরোধী এ কাব্য রুচিহীন গ্রাম্যতা,যৌনকামনা,মিলনের বর্ণনায় অশ্লীল অনুভূতির ব্যঞ্জনার অভাব এ কাব্যকে করেছে বিতর্কমুখর।তাই মধ্যযুগের আদি নিদর্শন হিসেবে এ কাব্যটি ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। 

বাংলা সাহিত্যের একেবারে গোড়ার দিকের নিদর্শন হচ্ছে চর্যাপদ। বেশিরভাগ পন্ডিতের মতে, চর্যাপদের রচনাকাল ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তুর্কি আক্রমণের ফলে বাংলা সাহিত্যে এক বড় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এ সময়কে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ। এর ব্যাপ্তিকাল হিসেবে ধরা হয় ১২০০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটির ভেতর ভণিতা থাকলেও কাব্যের নাম নেই।সম্পাদক কিংবদন্তি অনুসারে ও কাব্যে কৃষ্ণলীলা সম্পর্কিত বিষয়বস্তু দেখে নাম দেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।তবে এই নাম যথার্থ নয়। 

কীর্তন কথাটির নামকরণে রয়েছে পন্ডিতদের আপত্তি।  ড.বিমানবিহারী মজুমদার মন্তব্য করেছেন "কীর্তন শব্দটির অর্থ হলো কীর্তি।খ্যাতি ও যশ বিষয়ক স্তুতিগান।অনন্ত বড় চন্ডীদাস কৃষ্ণের চরিত্র যতদূর সম্ভব মসীলিপ্ত করিয়া অংকিত করিয়াছেন। তাঁহার অংকিত কৃষ্ণচরিত্রের সাথে প্রেমের কোন সম্পর্ক নাই।সে শুধু আত্মতৃপ্তি চায়, সে নায়িকাকে শুধু গালাগালি করে না,তাকে ফৌজদারী মামলার আসামীর মতো মায়ের গালি খাইয়া নায়িকার নামে কুৎসাও রটনা করে। বসন্তরঞ্জন বাবুর আবিষ্কৃত খন্ডিত পুঁথির নাম রাধাকৃষ্ণের ধামালী বললে ঠিক হয়।"

পুঁথিতে প্রাপ্ত একটি চিরকুট অনুসারে এর প্রকৃত নাম 'শ্রীকৃষ্ণসন্দবর্ব'।কাব্যটি খন্ডিত হওয়ার কারণে বড়ু চন্ডিদাস সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না।সম্পাদকের মতানুসারে কবির জম্নকাল ১৪০৩,১৪১৭,১৩৮৬ থেকে ১৪০০ এর মধ্যে।ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, জন্মগত সামাজিক বন্ধনের দিক থেকে কবি বড়ু চন্ডীদাস এর জীবন কাল ১৩৭০ থেকে ১৪৩৩।ছাতনার রাজা হামির ১৩৭৩ থেকে ১৪০৪ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।কবি এসময় ছাতনায় ছিলেন।

কবির ধর্মমত সম্পর্কেও মতভেদ আছে। কবি ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত,সুদক্ষ অনুবাদক।তাই ড.শহীদুল্লাহ মনে করেন কবি সম্ভবত কায়স্থ ছিলেন।তিনি আরো মনে করেন,চন্ডীদাস বৈষ্ণব ছিলেন না। তিনি ছিলেন সনাতনপন্থী ও তাঁর উপাস্য ছিলেন চন্ডীদেবী। 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য এর রচনাকাল নিয়েও বিরোধ রয়েছে।পুঁথিতে প্রাপ্ত চিরকুটটি ১০৮৯ বংগাব্দ এর।সে হিসেবে এটি ১৬৮২ নাগাদ বনবিষঞুপুরের রাজগ্রন্থাগারের সংগৃহীত ছিল।এখানে বলতে হয় অবশ্যই পুঁথিটি চিরকুট অপেক্ষা প্রাচীনতর।

রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের মতে,এই পু্ঁথিটি ১৩৫৮ সালের পূর্বে লিখিত। 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য মোট ১৩টি খণ্ডে রচিত। যদিও শেষ খণ্ডটা নিয়ে একটু বিতর্ক রয়েছে, খণ্ডের নামে 'খণ্ড' শব্দটি নেই বলে।

১. জন্ম খণ্ড: রাধা এবং কৃষ্ণ দুজনই ঈশ্বরের ইচ্ছায় মর্তে মানব রূপে জন্ম নেয়। কৃষ্ণ কংস রাজাকে বধ করার উদ্দেশ্যে দেবকী ও বাসুদেবের ঘরে সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়। কংস রাজা কৃষ্ণকে হত্যা করতে পারে এই ভয়ে জন্মের সাথে সাথেই বাসুদেব কৃষ্ণকে বৃন্দাবনে রেখে আসে। রাধাও সেই বৃন্দাবনেই এক গোয়ালার ঘরে জন্মগ্রহণ করে। দৈবইচ্ছায় বালিকা বয়সেই রাধার বিয়ে হয়ে যায় এবং বৃদ্ধা পিসি বড়ায়ি রাধার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে থাকে।

২. তাম্বুল খণ্ড: বড়ায়ি এবং সাথীদের সঙ্গে করে মথুরাতে দুধ বিক্রি করতে যায় রাধা। পথে বৃদ্ধা বড়ায়ি রাধাকে হারিয়ে ফেলে এবং কৃষ্ণের কাছে রাধার রূপের বর্ণনা করে জিজ্ঞেস করে সে রাধাকে দেখেছে কি না। রূপের বর্ণনা শুনে কৃষ্ণ রাধার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং কৌশলে রাধার কাছে প্রেম নিবেদন করে। কিন্তু বিবাহিতা রাধা তা প্রত্যাখ্যান করে।

৩. দান খণ্ড: মথুরাগামী রাধা এবং তার সঙ্গীদের পথরোধ করে কৃষ্ণ। নদী পারাপার করিয়ে দেবার বিনিময়ে কৃষ্ণ রাধার সঙ্গ প্রত্যাশা করে। কিন্তু রাধা কৃষ্ণের প্রস্তাব প্রত্যাখান করার চেষ্টা করে।

৪. নৌকা খণ্ড: এরপর থেকে রাধা কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে। একদিন কৃষ্ণ নৌকার মাঝি সেজে রাধাকে নৌকায় তুলে মাঝ নদীতে নিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেয় এবং রাধার সঙ্গ লাভে সমর্থ হয়। নদী তীরে ওঠার পর রাধা লোকলজ্জার ভয়ে সবাইকে এটা বলে যে মাঝ নদীতে নৌকা ডুবে গিয়েছিল। কৃষ্ণই তাকে নদী থেকে তুলে বাঁচিয়েছে।

৫. ভার খণ্ড: এরপর থেকে রাধা ঘরের বাইরে বেরোয় না। কিন্তু রাধা দর্শনের জন্য কৃষ্ণ কাতর। সে বড়ায়িকে দিয়ে রাধার শাশুড়িকে রাজি করিয়ে রাধাকে আবার দুধ বিক্রির জন্য ঘর থেকে বের করায়। এবার কৃষ্ণ ছদ্মবেশে মজুর হিসেবে রাধার কাছে আসে এবং ভার বহনের মজুরি হিসেবে রাধার আলিঙ্গন প্রার্থনা করে। রাধাও কাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কৃষ্ণকে মথুরা পর্যন্ত ভার বহন করায়।

৬. ছত্র খণ্ড: মথুরা থেকে ফেরার পথে কৃষ্ণ তার আলিঙ্গন দাবি করে। কিন্তু রাধা চালাকি করে সূর্যের তাপের কথা বলে তাকে ছাতা নিয়ে বৃন্দাবন পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে। আলিঙ্গনের আশায় আশায় কৃষ্ণ বৃন্দাবন পর্যন্ত রাধাকে পৌঁছে দেবার পরও রাধা তার কথা রাখেনি।

৭. বৃন্দাবন খণ্ড: কৃষ্ণের প্রতি এরূপ ঔদাসীন্য দেখে কৃষ্ণ এবার নতুন পথ খোঁজে। সে বৃন্দাবনকে অপূর্ব শোভায় সাজিয়ে তুলল। এই সৌন্দর্য দেখে রাধা তার প্রতি অনুরক্ত হয়।

৮. কালীয়দমন খণ্ড: এবার কালীয়নাগকে তাড়াতে কৃষ্ণ যমুনা নদীতে ঝাঁপ দেয়। কালীয়নাগের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় কৃষ্ণের প্রতি রাধার কাতরতা প্রকাশ পায়।

৯. যমুনা খণ্ড: রাধা ও তার সঙ্গীরা যমুনা নদীতে জল আনতে যায়। কৃষ্ণ হঠাৎ নদীতে ডুব দেয়। রাধা ভাবে কৃষ্ণ হয়তো ডুবে গেছে। তাই রাধা ও তার সঙ্গীরা কৃষ্ণকে খুঁজতে শুরু করে। এদিকে কৃষ্ণ জল থেকে লুকিয়ে উঠে যায় এবং নদীতীরে রাখা রাধার গলার হার চুরি করে কদম গাছে উঠে বসে থাকে।

১০. হার খণ্ড: রাধা কৃষ্ণের চালাকি বুঝতে পেরে কৃষ্ণের পালিত মায়ের কাছে নালিশ জানায়। কিন্তু কৃষ্ণ হার চুরির কথা অস্বীকার করে। এদিকে বড়ায়ি সব কিছু বুঝতে পেরে রাধার স্বামী যাতে হার চুরির বিষয় জানতে না পারে সেজন্য বলে যে রাধার হার হারিয়ে গিয়েছে।

১১. বাণ খণ্ড: হার চুরি এবং নালিশ এই ঘটনাদ্বয়ের পরিপ্রেক্ষিতে রাধা এবং কৃষ্ণের মাঝে মনোমালিন্য দেখা দেয়। বড়ায়ি এবার কৃষ্ণকে বুদ্ধি দেয় যাতে কৃষ্ণ রাধাকে প্রেমবাণে বশীভূত করে। তাই সে পুষ্পধনু নিয়ে কদম তলায় বসে এবং রাধা কৃষ্ণের প্রেমবাণে পতিত, মূর্ছিত এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

১২. বংশী খণ্ড: কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রাধার মন স্থির থাকে না, সে কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পারে না। তাই বড়ায়ি এবার রাধাকে বুদ্ধি দেয় যাতে সে কৃষ্ণের বাঁশি চুরি করে এই সমস্যা থেকে সমাধান পায়।

১৩. রাধাবিরহ: রাধা যখন সর্বত্যাগী হয়ে নিজেকে কৃষ্ণের কাছে সমর্পণ করতে প্রস্তুত তখন কৃষ্ণ রাধার প্রতি উদাসীনতা দেখায়। এরপর হঠাৎ করেই থেমে যায় রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী, কারণ এর পরবর্তী পাতাসমূহ আর পাওয়া যায় না। সেজন্য রাধা এবং কৃষ্ণের সর্বশেষ পরিণতি কী হলো তা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের সাহায্যে বলা যাচ্ছে না।

রাধাকৃষ্ণ ও বড়াই -এই তিন চরিত্রে অবলম্বনে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কাহিনি রূপান্তরিত হয়েছে।প্রধান চরিত্র রাধা এ চরিত্র কেন্দ্র করেই কাব্যের আখ্যানবস্তুর বিকাশ ঘটেছে।রাধা চরিত্রের বিকাশে ও পরিণতিতে বড়ু চন্ডীদাস যে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তা বিস্ময়কর।কাব্যের প্রথমে তাম্বুলখন্ডে যে এগারো বছরের রাখার পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে, 'সে সংসারনভিজ্ঞ রুঢ় সত্যভাষিনী অল্পবয়সী অশিক্ষিত গোপ বালিকা।তারপর কবি ঘটনা কৌশলে মূঢ় বালিকাচিত্তে কামের ও প্রেমের যে উন্মেষ ও বিকাশ ঘটালেন তাতে গোপকন্যা শাস্বতরসিক চিত্তবলভীর পৌঢ়পারাবতীর শ্রীধারায় পরিণত হয়েছে।রাধার এগারো থেকে তের বৎসর বয়স পর্যন্ত চিত্তোন্মচন ও দেহমন সম্বনিত উদ্বুদ্ধ মানসিকতার কাহিনী শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের গান স্বর্গলোকের উদ্দেশ্যে নিবেদিত নয়,জগত সংসারের নরনারীর প্রেমময় মনের কামনাবাসনার প্রতিফলনে বিশিষ্ট হয়ে বড়ু চন্ডীদাস তার বিস্ময়কর কবি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।কাব্যটি গীতিরস,কাব্যিক লাবন্য,নাট্যগুন সংলাপে সমৃদ্ধ।আখ্যান পরিকল্পনায়, চরিত্রচিত্রনে,ভাবে ভাষায় একে একে সুগঠিত নাট্য গীতিকাব্যের কবির কৃতিতব নিহিত।কাব্যের রচনাগীতি ও কাব্যকলাতে কবি যে অসাধারণ প্রাজ্ঞ ছিলেন তার নিদর্শন এ কাব্যে বিদ্যমান।বর্ননাকৌশল,অলংকার সন্নিবেশ,শব্দযোজনার ক্ষেত্রেও কবির কৃতিতব কম নয়।রাধার রুপের বর্ননা দিয়ে কবি লিখেছেনঃ 

"কনক কমলরুচি বিমল বদনে। 

দেখি লাজে গেলা চান্দ দুঈলাখ যোজনে।।

ললিত আলোক পাঁতি কাঁতি দেখি লাজে।

তমাল কলিকা ফুল রহে বন মাঝে।।

আলস লোচন দেখি কাজলে উজল।

জলে পসি তপ করে নীল উতপল।।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের প্রাপ্ত পুঁথিটি কবির স্বহস্তলিখিত নয়,এক বা একাধিক লিপিকরের লেখা।তাই এর রচনাকাল লিপিকালের পূর্বেকার।ড.সুনীতিকুমার এ কাব্যের ভাষাকে ১৫০০ সালের পূর্বের বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।তাছাড়া রসবিচারে কাব্যটির ভাষা চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী বলা যায়।বড়ু চন্ডীদাস আদি মধ্যযুগ তথা চৈতন্যপূর্ব যুগের কবি।চৈতন্যদেবের জন্ম ১৪৮৬ সালে।বড়ু চন্ডীদাস এর আগেই কবিখ্যাতি লাভ করেছিলেন। জনশ্রুতি অনুসারে কবির জন্মসাল ১৩২৫ থেকে ১৪১৭ এর মধ্যে।চন্ডীদাস যে চৈতন্যদেবের পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন তার সমর্থনে ড.মুহম্মদ শহিদুল্লাহ 

বৈষ্ণব সাহিত্য থেকে তথ্য প্রমাণ উল্লেখ করেছেন। জয়ানন্দ মিশ্র তাঁর চৈতন্যমংগলে লিখেছেনঃ 

"জয়দেব বিদ্যাপতি আর চন্ডীদাস।

শ্রীকৃষ্ণচরিত তারা করিল প্রকাশ।।"

১৫৮১ সালে রচিত শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে আছে, 

'বিদ্যাপতি জয়দেব চন্ডীদাসের গীত।

আস্বাদয়ে রামানন্দ স্বরুপ সহিত।।"

সুখোময় মুখার্জি লিখছেন, চৈতন্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আস্বাদন করেন নি,করলে এই কাব্যকে ভক্ত বৈষ্ণবরা মাথায় করে রাখতো।শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এভাবে কালের অতলে হারিয়ে যেত না।তার মতে পনের শতকের শেষার্ধে বড়ু চন্ডীদাস বর্তমান ছিলেন। 

ড.আহমদ শরীফ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, "পনের শতকের কবি কৃত্তিবাস,মালাধর বসু,শাহ মুহম্মদ সগীর,বিজয়গুপ্ত প্রভৃতির ভাষা থেকে প্রাচীনতম ভাষার নিদর্শন, জয়দেবের বিশেষ প্রভাব নায়ক চরিত্রের গুণাভাব,কথক্তা সুলভ ঘটনা ও পদবিন্যাস লোক নৃত্যনাট্যের আংগিক ও পদাবলি সংকলন গ্রন্থে বড়ু চন্ডীদাসের বিক্ষিপ্ত স্বয়ংসম্পূর্ন পদের অভাব একাধিক পুঁথির অপ্রাপ্যতা প্রভৃতি দেখে আমাদের মনে হচ্ছে বৈষ্ণবতত্তব বিরোধী এ গ্রন্থ নিশ্চিতভাবেই চৈতন্যপূর্বকালের ও আনুমানিক ১৪২৫ এ রচিত।"


                               

অনুমান করা চলে চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি কোন সময়ে বড়ু চন্ডীদাস জন্মগ্রহন করেছিলেন এবং চৌদ্দ শতকের শেষে তার কাব্য রচনা করেন।ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে,পুঁথির লিপি ১৪৩৬ থেকে ১৫২০ পর্যন্ত বিস্তৃত। তার মতে এর লিপিকার আনুমানিক ১৪০০ সাল।তিনি মনে করেন কাব্যটি ১৩৪০ থেকে ১৪৪০ পর্যন্ত বিস্তৃত। 

বড়ু চন্ডীদাসের আবির্ভাবের স্থান সম্পর্কেও মতভেদ আছে।কারো মতে তার জন্ম বীরভূমের নান্নুর কারো মতে ছাতনা।নানা প্রবাদ, সহজিয়া গ্রন্থ প্রভৃতি অনুসারে নান্নুর বাসলী দেবীর জন্মস্থান ও চন্ডীদাসের জন্মস্থান।

আবার ছাতনা গ্রামেও বাসলী দেবীর মন্দির ও চন্ডীদাসের ভিটার প্রবাদ আছে।এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন সম্ভব না।হয়তো কোন এক চন্ডীদাস ছাত্নায় আবার কেউ নান্নুরে জন্মগ্রহন করেন।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে খন্ডিতপদসহ মোট পদসংখ্যা ৪১৮  টি।সংস্কৃত শ্লোক আছে ১৬১ টি।পাতার সংখ্যা ২২৬।মাঝের ৪৫ পৃষ্ঠা পাওয়া যায়নি।৪১৮ টি পদে ভণিতা আছে ৪০৯ টি।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর প্রধান কাহিনী ভাগবত থেকে সংগৃহীত।মাঝে কিছু জয়দেবের গীতগোবিন্দ থেকে নেয়া।পদ্মপুরাণ,বিষঞুপুরাণ,ভাগবত অনুসরণে কৃষ্ণ এর জন্মকাহিনী,বাল্যলীলা বর্নিত।কবি পুরাণে লীলা অপেক্ষা গ্রামীন সমাজে প্রচলিত অপৌরানিক কাহিনির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর প্রথম দিকে যে দেহগত কামনা বাসনার সুতীব্র প্রকাশ লক্ষ করা যায় শেষ পর্যায়ে বংশী ও বিরহ খন্ডে তা পরিবর্তিত হয়ে মানব প্রেমচেতনার অতীন্দ্রিয় অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে।এখানেই বৈষ্ণব পদাবলীর সাথে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সাদৃশ্য।শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর রাধা বুনো ফুল, বুলো রুপ,বুনো গন্ধ,রস গ্রাম্য যৌনতাদুষ্টু, সে ভোগ্য।পদাবলির রাধা যত্নে লালিতা ফুল,তার রুপ রস গন্ধ নগুরে,সূক্ষ্ম ও সে প্রেম উপভোগ্য। 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অপরিসীম। এই কাব্য আবিষ্কৃত না হলে হয়তো প্রাচীন বাংলা সাহিত্য এবং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মধ্যে যে অন্ধকার যুগটা রয়েছে সেটা আরো প্রলম্বিত হতো। সেই সাথে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপের সঙ্গে মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার যে সেতুবন্ধন হয়েছে এই আদি মধ্যযুগের কাব্যের মাধ্যমে সেটা হয়তো সম্ভব হতো না।

এছাড়াও এর সাহিত্যিক তাৎপর্যও কম নয়। কাব্যের গল্প পাঠে আমরা দেখতে পাই, এখানে কৃষ্ণকে দেবতা হিসেবে না দেখিয়ে গ্রামের চঞ্চল যুবক হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ দেবতার মানবায়ন ঘটেছে সেখানে। যদিও পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন সমাদর পায়নি বলা যায় এ কারণে যে পরবর্তীতে বৈষ্ণব পদাবলীর সাহায্যে শ্রীকৃষ্ণের উপস্থাপনের আঙ্গিক সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। তৎকালীন বৈষ্ণব পদাবলীর পদকর্তাগণ, গুরুজন, তারা কৃষ্ণের মানবায়নকে খুব একটা পছন্দ করেননি। এ কারণেই ধারণা করা হয় যে এই 'কৃষ্ণকীর্তন'কে লুকিয়ে ফেলা বা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে দেবতাদের দেবত্বের যে শৃঙ্খল, সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার প্রথম প্রয়াস এই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ভাষার বৈশিষ্ট্যঃ 

১/প্রাকৃত ও অপভ্রংশের উচ্চারণ আদর্শে অ ধবনির হ্রস্ব আ এবং আ ধবনির দীর্ঘ আ উচ্চারণ। আনেক,আতি।

২/উদ্দ্বৃত্তস্বর তখনও শব্দ শেষে খানিকটা রক্ষিত হয়।গাআ।

৩/প্রাকৃত প্রভাবিত এক ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব রুপ সর্বনামে দৃষ্ট হয়।আক্ষ্মে। 

৪/পাশাপাশি দুই স্বরধবনির এক যুগ্মস্বরে সংশ্লিষ্ট উচ্চারণ বাংলা বাক্যরীতিতে প্রভাব সূচিত করে। বুইল। 

৫/নাম ধাতুর যথেষ্ট ব্যবহার।চুম্বিলা। 

৬/ভাষায় ঈ কারান্ত স্ত্রীলিঙ্গের রুপ। কমলবদনী।

2 Comments

Post a Comment

Previous Post Next Post