মেঘনাদ সাহা
(অক্টোবর ৬, ১৮৯৩ – ফেব্রুয়ারি ১৬, ১৯৫৬) একজন ভারতীয় বাঙালি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করলেও পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়েও গবেষণা করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানে তার অবদানের জন্য ১৯২৭ সালে লন্ডনের রয়াল সোসাইটি তাকে এফআরএস নির্বাচিত করে |
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা জেলার একটি গ্রামে 1893 সালে 6ই অক্টোবর মেঘনাদ সাহা জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বাবার নাম জগন্নাথ সাহা, মায়ের নাম ভুবনেশ্বরী দেবী। পাঁচ পুত্র এবং তিন কন্যার মধ্যে মেঘনাদ ছিলেন পঞ্চম সন্তান। পুত্রদের মধ্যে তৃতীয়। জগন্নাথের ছিল মুদির দোকান। দোকানের আয় থেকে এত বড়ো পরিবারটি সচ্ছলভাবে চলত না। জগন্নাথ এবং তাঁর স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী উভয়ই ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী। ছেলেমেয়েদের বড়ো করে তোলায় তাদের ত্যাগ ছিল অসামান্য। মায়ের সাথে মেঘনাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। মায়ের বাক্য তিনি বেদ বাক্য হিসাবে মানতেন। ছোটোবেলায় কোনো একটি কারণে মা তাকে পূর্ব দিকের জানালা খুলে শুতে বারন করেছিলেন। সেই নিষেধাজ্ঞা সারা জীবন মনে রেখেছিলেন। যুক্তিবাদী মানুষটির এই সারল্য লক্ষ করার মতো। মেঘনাদ ছিলেন সুস্থ সবল শিশু। ছোটোবেলাতে তিনি পাল্লা দিয়ে সাঁতার কাটতেন, নৌকা চালাতেন, যখন তখন হৈ-হুল্লড়ে মেতে উঠতেন। সেখানকার পরিবেশ শিক্ষার অনুকূল ছিল না। জগন্নাথ তাঁর বড়ো ছেলে জয়নাথকে ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বড়ো ছেলে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি। তাই জগন্নাথ ভেবে ছিলেন অন্য ছেলেদের আর লেখাপড়া শেখাবেন না। বড়ো হলেই তাঁর মুদিখানার দোকানে বসিয়ে দেবেন। সেই মতো বর্ণপরিচয় পাঠ শেষ হওয়ার সাথে সাথে মেঘনাদকে দোকানে বসতে হয়।মাথায় ছাতা, খাবারদাবার, ও হাতে বই নিয়ে মেঘনাদ দোকান দেখতে যেতেন। এই ছিল শেওড়াতলি গ্রামের অতি পরিচিত দৃশ্য। তাসত্ত্বেও সাত বছর বয়সে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন মেঘনাদ। সেখানকার শিক্ষকরা মেঘনাদের অসাধারন স্মৃতিশক্তি এবং মেধার পরিচয় পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। মেঘনাদ সব বিষয়ে তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করতেন। যা শিখতেন তা ভুলতেন না। যাতে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন সে বিষয়ে শিক্ষকদের বিশেষ আগ্রহ ছিল। স্লেট পেন্সিল না পেলে তিনি মায়ের আঁচল ধরে কাঁদতে বসতেন। প্রাইমারি স্কুল শেষ হলে শিক্ষকেরা হাই স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য তাঁর বাবার কাছে এলেন। শেওড়াতলির গ্রামে হাই স্কুলের ব্যবস্থা নেই। এদিকে দূরে ছেলেকে রেখে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই জগন্নাথের। শেষে বড়ো ছেলে বাবাকে রাজি করালেন। শিমুলিয়াতে একটি মিডল ইংরাজি বিদ্যালয় ছিল। সেখানেই মেঘনাদকে ভর্তি করা হল। তিনি সেখানে একজন ডাক্তারদের বাড়িতে থাকতেন। বিনা মূল্যে খাওয়াদাওয়া জুটত। কিন্তু শর্ত ছিল এরজন্য তাঁকে গৃহকর্মে সাহায্য করতে হবে।
শুরু হল মেঘনাদের কঠিন কঠোর জীবনযাত্রা। স্কুল থেকে এসে তাঁকে ডাক্তার বাবুর বাড়ির সব কাজ করতে হতো। তবু কেউ তাঁকে সঙ্কল্প থেকে টলাতে পারেনি। সপ্তাহের শেষে তিনি সাত মাইল পথ হেঁটে বাড়ি যেতেন। ঢাকা জেলার মধ্যে তিনিই প্রথম বৃত্তিসহ মিডল স্কুল থেকে পাশ করলেন 1905 খ্রিস্টাব্দে। ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। বৃত্তির পরিমান ছিল মাসে চার টাকা। এছাড়া দাদা দিতেন পাঁচ টাকা এবং ঢাকার বৈশ্য সমিতি দিত দু-টাকা। এতেই তিনি তাঁর সারা মাসের খাওয়া খরচ চালিয়ে নিতেন। যে বছরই তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন সে বছরই কার্জনের নির্দেশে বাংলাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। বঙ্গভঙ্গের এই নির্দেশের প্রতিবাদে সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল। একদিন ছোটোলাট ফুলার এলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পরিদর্শনে। স্কুলের ছেলেরা ঠিক করে ক্লাস বয়কট করবে। এই বয়কটের ফলে মেঘনাদকে স্কুল থেকে বিতারিত হতে হয়। স্কলারশিপও বন্ধ হয়ে যায়। এরপরে তিনি কিশোরীলাল জুবিলি নামে একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি হলেন। সারা বাংলার সমস্ত শ্রেনির ছাত্রদের মধ্যে সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তিনি প্রথম হলেন। পুরষ্কার স্বরূপ একটা বড়ো আকারের মুদ্রিত বাইবেল পেলেন। নগদ একশো টাকাও পেয়েছিলেন। সময় পেলেয় তাঁর শৈশবের জায়গায় ভিরে আসতেন। এবং বাবার কাজে সাহায্য করতেন। 1909 খ্রিস্টাব্দে তিনি পূর্ববঙ্গের সমস্ত স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম হয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। প্রতিটি বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন।
ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর অসাধারন ব্যুৎপত্তি ছিল। পঞ্জিকা এবং গণিত শাস্ত্রেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কথা ও কাহিনী' এবং মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য' ছিল তাঁর প্রিয় গ্রন্থ। স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি এলেন ঢাকা কলেজে। ইন্টারমিডিয়েটে ক্লাসে সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হলেন। তখন রসায়ন পড়াতেন অধ্যাপক ই. সি ওয়াটসন সাহেব। ইংরেজি পড়াতেন অধ্যাক্ষ ডব্লু জি. এ আকিতেন। পদার্থবিদ্যায় ছিলেন বি এন দাস গণিতে নরেশচন্দ্র বোস এবং কে পি বোস। এছাড়া নেঘনাদ জার্মান ভাষা শিক্ষা নিতেন অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ সেনের কাছে। এটি ছিল তাঁর অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতে তিনি তৃতীয় হয়েছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে তিনি গণিতে অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে বি এস সি ক্লাসে ভর্তি হলেন। বৃত্তির টাকাই ছিল একমাত্র সম্বল। প্রেসিডেন্সিতে পদার্থবিদ্যা পড়াতেন অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসু রসায়নে প্রফুল্লচন্দ্র রায়, গণিতে অধ্যাপক ডি এন মল্লিক এবং সি ভি কালিশ। সারা জীবন তিনি বিঞ্জানসাধক হিসেবেই কাটিয়ে ছিলেন। বিঞ্জানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণা করেছেন। গবেষণা করেছেন জাতীয় সময় পঞ্জিকা নিয়ে। শেষ অবধি তিনি রাজনীতির আবর্তে জড়িয়ে পড়েন। সংসদ হয়েছিলেন, যোগ দিয়েছিলেন লোকসভাতে। তাঁর ভাষন শুনে বিরোধীপক্ষের সদস্যরাও অবাক হয়ে যেতেন। বিশ্ববিশ্রুত পদার্থ বিঞ্জানী মেঘনাদ সাহা সাহা সমীকরণ নামে একটি মূল্যবান সূত্র আবিস্কার করেন। এই সূত্র থেকে বিভিন্ন চাপে ও উষ্ণতায় কোন পদার্থের আয়তনের মাত্রা কত হবে সেটা জানা যায়। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ "দি প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি ", ট্রিটাইজ অন হিট", "ট্রিটাইজ অন মর্ডান ফিজিক্স", "জুনিয়র টেক্সট বুক অব হিট উইথ মেটিওরোলজি"।
Post a Comment