দিগম্বরী স্বামী
টেগোর কোম্পানির একটি মূল্যবান জাহাজ ঢুবে গেলো অকূল সাগরে,দ্বারকানাথ সেদিন বুকভাঙা নিশ্বাসের সঙ্গে বললেন "লক্ষী চলিয়া গিয়াছেন,অলক্ষীকে এখন আটকাবে কে"?
দিগম্বরী স্বামীকে ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা,কাকুতি-মিনতি করলেও সেদিন যিনি কর্ণপাত করেন নি,তবে কেন তাঁর মুখ দিয়ে বের হল "লক্ষী চলিয়া গিয়াছেন"৷
চলুন যাই আমরা বরং সেই গল্প একটু শুনি৷
সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিগম্বরীর মত সাহস আর শক্তি সম্ভবত তাঁর পুত্রবধূদের মধ্যেও ছিল না!শাশুড়ি অলকাসুন্দরীও এই ব্যক্তিত্বময়ীকে সমীহ করে চলতেন৷
ঠাকুরবাড়ি কোনওদিন আর পাঁচটা সাধারন বাড়ির মত আটপৌরে ধরনের ছিল না বরং,
সাহিত্য,সংগীত বা শিল্পের দিক থেকে কিছু পাবার আগে বাঙালি নারীরা ঠাকুরবাড়ির নারীদের কাছে পেয়েছিলেন আত্মবিশ্বাস,সাহস,শক্তি আর এগিয়ে যাবার একটি লম্বা প্রশস্ত পথ৷
দ্বারকানাথের আমল থেকে ঠাকুরবাড়িতে জীবনযাত্রার একটা নিজস্ব ধারা গড়ে উঠেছিল৷ অপরূপ লাবণ্যময়ী দিগম্বরী এসেছিলেন ঠাকুরবাড়ির লক্ষ্মী হয়েই৷যখন তিনি দ্বারকানাথের ধর্মপত্নী হয়ে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এলেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ছয়৷ঠাকুরবাড়ির শ্রীবৃদ্ধি কার্যত তিনি বধূ হয়ে আসার পর থেকেই৷
দিগম্বরীর রূপ প্রবাদে পরিনত হয়েছিল৷
প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁকে বলতেন 'সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী'৷
দুধে-আলতা মেশা গায়ের রঙ,পিঠে এক ঢাল -কোঁকড়া কালো চুল,চাঁপাকলির মত হাতের আঙুল,দেবী প্রতিমার পায়ের মত দুখানি পা,রূপের সঙ্গে ছিল দিগম্বরীর প্রবল তেজ৷
দ্বারকানাথ যদিও প্রথম দিকে বেপরোয়া খুশির প্রমোদে গা ঢেলে দেন নি৷দিলদরিয়া একটা মন ছিল তাঁর,আর ছিল শিল্পরুচি৷তাঁর বেলগাছিয়ার বাড়িতে এক প্রহরের আমোদে যে কত ঐশ্বর্য নষ্ট হয়েছে তার সত্যি সীমা নেই৷
নিজের মত জীবনযাপন করবেন দ্বারকানাথ সেজন্য পাঁচ নম্বর বাড়ি তৈরি করলেন৷ বাড়িটি তৈরি হয় ১৮২৩সালে৷
অসাধারন সব কারুকাজ,ফোয়ারা,রঙিন টালি-ঘেরা বাগান,ঝাড়লন্ঠন,বিলিতি আসবাবে নিজের রুচিমত সাজালেন৷তাঁর নতুন 'গৃহসঞ্চার'-এর কথা ফলাও করে ছাপা হয়েছিল সেদিনকার কাগজে৷
প্রকান্ড ভোজ,নাচ-গান,বিলিতি ব্র্যান্ডের সঙ্গে ভাঁড়ের সং-এর আয়োজন ছিল৷
দ্বারকানাথ একসময় গর্ভনমেন্টের দেওয়ান ছিলেন পরে উন্নতির শিখরে পৌঁছে যান৷
দিগম্বরীর চোখে প্রথম দিকে তাঁর এত পরিবর্তন চোখে পড়েনি,নিজের জপ-তপ ঠাকুরসেবা নিয়ে তিনি তখন ব্যস্ত৷ভোর চারটে থেকে তাঁর পুজো শুরু হত৷
লক্ষ হরিনামের মালা জপ ছাড়াও পড়তেন ভাগবত-রাসপঞ্চাধ্যায়ের বাংলা পুঁথি৷
মাঝে-মধ্যে নানা কথা তাঁর কানে যায়,কিছু শোনেন,কিছু ভুলে যান৷আর কৃতী পুরুষের গায়ে কাদা ছিটোবার সুযোগ সর্বদা নিন্দুক নিতেই চায়৷প্রথম দিকে সব শুনে ভাবতেন হয়ত গুজব,কিন্তু সে যে দিনে দিনে আরো বেড়ে যায়৷
ছড়ার গান দিগম্বরীর কানে যায়,
বেলগাছিয়ার বাগানে হয় ছুরিকাঁটার ঝনঝনি,
খানা খাওয়ার কত মজা আমরা তার কি জানি?
জানেন ঠাকুর কোম্পানি'৷
প্রথম দিকে কিছুই বিশ্বাস হত না দিগম্বরীর৷
অবশেষে নিসংশয় হবার জন্য তিনি স্থির করলেন নিজেই যাবেন স্লেচ্ছ ভোজসভায়৷নিজের চোখেই দেখবেন সত্য কি আর মিথ্যা কি৷
অন্দরমহল থেকে বৈঠকখানার বাড়িতে প্রবেশ করতে গিয়ে দিগম্বরী কেঁপেই উঠেছিলেন৷
চোখের সামনে দেখলেন আলো-ঝলমলে ঘরে সাহেব-বিবিদের সঙ্গে একাসনে পানাহারে মত্ত স্বামী৷বাবুর্চির রান্না খাবার টেবিলে পরিবেশন করা হচ্ছে৷
বিপথগামী স্বামীকে ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা,কাকুতি-মিনতি করলেন দিগম্বরী,তবে সেই কাকুতি-মিনতিতে কর্ণপাত করলেন না দ্বারকানাথ৷
স্বামীর এহেন আচরনে তিনি মানসিক ভাবে কতটা ভেঙে তিনি পড়েছিলেন, একথা হয়ত স্বয়ং তিনি বলতে পারতেন,তবে তাঁর মত তেজস্বিনী নারীর কাছে ধর্ম আর কর্তব্য যে সবার আগে৷
তিনি পন্ডিতদের কাছে মতামত চেয়ে পাঠালেন৷
কী করবেন তিনি?
স্বামীর সহধর্মিনী হয়ে কুলধর্ম ত্যাগ নাকি স্বামীকে ত্যাগ করে কুলধর্ম বজায় রাখবেন?
দ্বারকানাথ অবশ্য ধর্মত্যাগী নন,কিন্তু যিনি স্লেচ্ছদের সঙ্গে একত্রে খানাপিনা করেন তাঁর ধর্মত্যাগের আর কি বা বাকি থাকে!
পন্ডিতরা বিচার-বিশ্লেষন করলেন,অনেক বিতর্কের পর উত্তর এল,
'স্বামীকে ভক্তি ও তাঁহার সেবা অবশ্য কর্তব্য,তবে তাঁহার সহিত একত্র সহবাস প্রভৃতি কার্য অকর্তব্য'৷
দিগম্বরীর স্বামীভক্তিতে সামান্যতম খাদ ছিল না,তবে তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন সেবা ছাড়া স্বামীর সঙ্গে অন্য সব সম্পর্ক ছিন্ন করবেন৷
এসব ঘটনা বাইরের কেউ জানতে যেন না পারে সে বিষয়ে যতেষ্ট সচেতন ছিলেন ৷
প্রতিদিন দ্বারকানাথের শয্যার কাছে গিয়ে মাটিতে একটি প্রণাম রেখে আসতেন৷
দ্বারকানাথ অবশ্য সম্পূর্ণ নির্বিকার৷
বাড়ির সাথে সম্পর্ক ঘুচিয়ে তিনি বাস করতে লাগলেন বৈঠকখানা বাড়িতেই৷একটা বাবুর্চিখানাও তৈরি হল সেখানে৷
বৈষয়িক বিষয়ে দ্বারকানাথের সঙ্গে দিগম্বরী কথা বলতে বাধ্য হলে সাত ঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করে তবেই নিজেকে শুদ্ধ করতেন,ছিল না দিন-রাতের বিচার৷
এই দুঃসহ অত্যাচার সহ্য করার কথা নয় তাঁর শরীরের,সহ্য করল না দিগম্বরীর শরীর৷কয়েকদিনের জ্বরবিকারে চিরদিনের জন্য নিভে গেল তাঁর জীবনদীপ৷টেগোর কোম্পানির একটি মূল্যবান জাহাজ ঢুবে গেলো অকূল সাগরে,দ্বারকানাথ সেদিন বুকভাঙা নিশ্বাসের সঙ্গে বললেন "লক্ষ্মী চলিয়া গিয়াছেন,অলক্ষ্মী এখন আটকাবে কে"?
গ্রন্থঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল চিত্রা দেব.
Post a Comment