বাংলার কথা সাহিত্য 09------নিকুঞ্জ সেন----

                                                     মহান বিপ্লবী নিকুঞ্জ সেন

  


মহান বিপ্লবী নিকুঞ্জ সেনের জন্ম হয় ১লা অক্টোবর ১৯০৬ সালে। ইনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙলার বিপ্লবী। নিকুঞ্জ সেনের জন্মস্থান অধুনা বাংলাদেশের ঢাকার কামারখাড়ায়। নিকুঞ্জ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পাশ করেন। পরে কলকাতা আসেন এম.এ পড়ার জন্য। তিনি ছাত্র জীবন থেকেই ছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে।

                 ১৯০৫ সালের বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের স্থাপিত বিপ্লবীদের গুপ্ত সমিতি যুগান্তর দল 'মুক্তি সংঘ' পরবর্তীকালে তিনি যোগ দেন। নিকুঞ্জ সেন তার পর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স' এর সদস্য হন। পরে তাকে কুমিল্লায় পাঠানো হয়, ললিত বর্মনের নেতৃত্বে দলকে শক্তিশালী করার। নিকুঞ্জ সেন ও ললিত বর্মনের বিপ্লবী প্রচেষ্টার ফল হিসাবে পেলেন কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ের দুই সহপাঠী কিশোরীকে। সেই সহপাঠী কিশোরীরা হলেন শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী। এই অগ্নিকন্যারাই ১৪ ই ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে কুমিল্লার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি.স্টিভেন্সকে হত্যা করেন।

                 বিপ্লবী নিকুঞ্জ সেন কিন্তু শিক্ষকতার মাধ্যমে দল ও সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে ঢাকার বিক্রমপুরের বানারিপাড়া স্কুলে যোগ দেন। সেখানেই ছাত্র হিসেবে পেলেন পরবর্তীকালের মহান বিপ্লবী  বাদল গুপ্তকে। বাদল গুপ্তের আসল নাম ছিল অবশ্য সুধীর গুপ্ত। নিকুঞ্জ সেন বাদল গুপ্তকে তৈরি করলেন বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে। তখন বাদলও বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে যোগ দেন। পরে মহান বিপ্লবী হেমন্ত ঘোষের অপর একজন সহযোগী বিনয় বসুও চিকিৎসা শাস্ত্রের পড়াশোনা ছেড়ে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলে দেন ও সহযোদ্ধাদের নিয়ে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের ঢাকা শাখা গড়ে তোলেন।

                 একসময় রাজবন্দীদের উপর অত্যাচার চালানোর জন্য সিম্পসন বিপ্লবীদের কাছে কুখ্যাত ছিলেন। এবার বিপ্লবীদের লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এন.এস সিম্পসন। সিম্পসনকে হত্যার সাথে সাথে ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। আরো এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হল সিম্পসনকে হত্যা করা হবে তাঁর অফিসে গিয়েই। তদানীন্তন সচিবালয়ে - কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিঙে  হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

                 বিপ্লবী বিনয় বসু হামলার নেতৃত্ব দেবেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। তার সঙ্গী হিসেবে থাকবেন বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত। নিকুঞ্জ সেন শুধু এদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন না। এই অভিযানের সমস্ত পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দিনটি ছিল ৮ই ডিসেম্বর ১৯৩০ সালে বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত একত্রে মিলে ইউরোপীয় বেশ ভূষায় সজ্জিত হয়ে রাইটার্স ভবনে প্রবেশ করেন ও সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। এই অভিযানে নিকুঞ্জ সেন আত্মগোপন করতে সক্ষম হন। ১৯৩১ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় ও ৭ বৎসর কারারুদ্ধ থাকেন।

                 নিকুঞ্জ সেন মুক্তি পাওয়ার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে আবারো গ্রেপ্তার হন। ও ১৯৪৬ সালে মুক্তি পান। সেই সময় তিনি সুভাষচন্দ্রের ফরওয়ার্ড ব্লক সংগঠনের কাজে নিয়োজিত থাকেন। শেষে শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গঠিত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান দলে যোগ দেন। দলের মুখপত্র 'মহাজাতি' তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত হত। জ্যোতিষ জোয়ারদারের 'নিশানা' ও সুভাষ সংস্কৃতি পরিষদ' এর সঙ্গেও তাঁর বিশেষ যোগ ছিল। নিকুঞ্জ সেন স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বাগু হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অপূর্ব সাংগঠনিক প্রতিভার অধিকারী হওয়ার ফলে সমাজ সেবা কেন্দ্র বাগু সপ্তগ্রামের 'পল্লী নিকেতন' এর সম্পাদক ছিলেন। নিকুঞ্জ সেন যেমন সুবক্তা ছিলেন তেমনই সুলেখক ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল -

১) জেলখানা কারাগার

২) বক্সার পর দেউলিয়া

৩) ইতিহাসে অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা

৪) নেতাজী ও মার্কসবাদ

                 এই মহান বিপ্লবী নিকুঞ্জ সেন ১৯৮৬ সালের ২ রা জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।



Post a Comment

Previous Post Next Post